ভারতে মুসলিম বিয়ে করায় আটক হিন্দু যুবতী, বাধ্যতামূলক গর্ভপাত9 মিনিটে পড়ুন

40

বগুড়া এক্সপ্রেস ডেস্ক

ভারতে বিতর্কিত ‘লাভ জিহাদ’ আইনের আওতায় আটক করা প্রথম নারীকে পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় গর্ভপাত করানো হয়েছে। মুসকান জাহান (২২) নামের ওই নারীকে বর্তমানে উত্তর প্রদেশের মুরাদবাদ শহরে এক সরকারি আশ্রয়স্থলে আটকে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি আশ্রয়স্থল থেকে ফোন করে তার শ্বাশুড়িকে গর্ভপাতের কথা জানান মুসকান। তার শ্বাশুড়ি অনুমান করছেন, জোর করে ইনজেকশন প্রয়োগ করে মুসকানের গর্ভপাত করানো হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বৃটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ।

খবরে বলা হয়, গত শুক্রবার নিজের শ্বাশুড়িকে ফোন করেন মুসকান। জানান, আচমকা ব্যাপক রক্তপাত শুরু হয় তার। আর এরপরই নিজের সন্তানকে হারিয়ে ফেলেন তিনি। মুসকান তিন মাসের গর্ভবতী ছিলেন।
মুসকানের শ্বাশুড়ি বেগম জাহানের আশঙ্কা, তার মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করে হিন্দু থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় মুসকানকে গর্ভপাত করতে বাধ্য করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এই অত্যাচারী দুনিয়া ওই শিশুটিকে পৃথিবীর মুখ দেখার আগেই মেরে ফেলেছে।’

মুসকানের স্বামীর নাম রশিদ (২৭) তাকেও আটক করে রাখা হয়েছে উত্তর প্রদেশের অজানা এক কারাগারে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মুসকানকে বিয়ে করে তাকে জোরপূর্বকভাবে হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেছেন তিনি। বিয়ের মাধ্যমে হিন্দু নারীদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে এই ধুয়ো তুলে হিন্দু-মুসলমান নারী-পুরুষের বিয়েকে ‘লাভ জিহাদ’ বলে থাকে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা। এই কথিত ‘লাভ জিহাদ’ রুখতে গত মাসে এক বিতর্কিত আইন পাস করে উত্তর প্রদেশ সরকার। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই আইন মূলত দেশে ধর্মীয় বিরোধ উস্কে দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র রাজনৈতিক কৌশল।
ধারণা করা হচ্ছে, চলতি মাসেই মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসনাধীন আরও চার রাজ্যে একইরকম আইন পাস হবে। যদিও গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয় সরকার স্বীকার করেছিল যে, তারা কথিত ‘লাভ জিহাদ’ -এর একটি ঘটনাও কোথাও খুঁজে পায়নি।

আইনটিতে অবশ্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের কথা উল্লেখ করা হয়নি। তবে উত্তর প্রদেশ পুলিশ এই আইন কেবল মুসলিমদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া অবদি অন্তত ১০ জন মুসলিমকে আটক করেছে তারা। এদের কেউই হিন্দু নয়।
মুসকান ও রশিদের দেখা হয় ভারতের দেরাদুন শহরে। অভাবে থাকা পরিবারকে সহায়তার জন্য বাড়ি ছেড়ে শহরটিতে নাপিত হিসেবে কাজ করতে গিয়েছিলেন রশিদ। সেখানে গিয়ে কোনোমতে দিন চলছিল তার। এর মধ্যে উত্তর প্রদেশ থেকে শহরটিতে আসা পিংকি নামের এক নারীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। তারা কাছাকাছি সেলুনে কাজ করতেন। এক পর্যায়ে প্রতিদিন সকালে এক সঙ্গে কাজে যাওয়া শুরু করেন তারা। রশিদের কথায় পিংকির মুখে হাসি ফুটতো।

রশিদের মা জাহান বলেন, প্রায় পাঁচ মাসে আচমকা একদিন রশিদ ফোন করে। উত্তেজিত কন্ঠে জানায়, হিন্দু মেয়েটিকে বিয়ে করেছে সে। আমি তাকে বকাঝকা করি। বলি যে, সে ভুল কাজ করেছে। জিজ্ঞেস করি যে, আমাদের সঙ্গে বিয়ে করার আগে কথা বলেনি কেন। রশিদ পরে জানায়, সে জুলাইয়ে বাড়ি আসবে। পিংকি যখন আমাদের বাড়িতে পুত্রবধু হিসেবে এলো, তার সঙ্গে আমরা নিজের মেয়ের মতোই আচরণ করেছি।
পিংকি অবশ্য তার বিয়ের আগেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। তার নাম হয় ‘মুসকান’। রশিদ মুরাদবাদে নতুন কাজ পেয়ে যায়। এরপর শিগগিরই মুসকান গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এতে তার শ্বাশুড়িও খুশি হন।

জাহান বলেন, সব মায়ের মতো আমারও স্বপ্ন ছিল যে, আমার ছেলে বিয়ে করবে। এরপর মুসকান গর্ভবতী হওয়ার খবর আমাদের খুশি আরো বাড়িয়ে দেয়। আমাদের বাড়িতে কোলে নিয়ে খেলার মতো কোনো শিশু নেই। আমাদের স্বপ্ন ছিল, আমরা মুসকানের শিশুটিকে সুশিক্ষা দিয়ে একজন ভালো মানুষ করে তুলবো।
শত শত বছর ধরে উত্তর প্রদেশে পাশাপাশি বাস করে আসছে হিন্দু ও মুসলিমরা। দুই ধর্মের মধ্যে বিয়ের ঘটনা বিরল হলেও, পুরো রাজ্যের মধ্যে এমন বিয়ের পরিমাণ প্রায় তিন শতাংশ। কিন্তু ২০১৯ সালে মোদি ব্যাপক ভোট পেয়ে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই ‘হিন্দুত্ববাদ রক্ষায়’ বেশকিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেছে বিজেপি। দলটির বিরুদ্ধে নিয়মিত হারে ইসলামভীতির ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে।

বিজেপির অভিযোগ, মুসলিম পুরুষরা হিন্দু নারীদের মগজধোলাই করে তাদের বিয়ে করার আগে ইসলাম গ্রহণ করিয়ে নিজেদের জনসংখ্যা বাড়াচ্ছে। এখানে উল্লেখ্য, ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ হচ্ছেন মুসলিম।
গত মঙ্গলবার উত্তর প্রদেশের কুশিনগরে হায়দার আলি নামের এক মুসলিমকে ‘লাভ জিহাদ’ করছে সন্দেহে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার উপর নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি তাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেলারও হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু পরেরদিন জানা যায়, তার স্রীনা জন্ম থেকেই মুসলিম ছিলেন। এরপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এদিকে, রশিদকে গ্রেপ্তার করা হয় গত সপ্তাহের রোববার। মুসকানের সঙ্গে তার বিয়ে নিবন্ধিত করতে মুরাদবাদের এক আইনজীবীর সঙ্গে তার পরিবার দেখা করার পরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রসঙ্গত, রশিদ ও মুসকান বিয়ে করেছিলেন পার্শ্ববর্তী উত্তরাখন্ড রাজ্যে।

আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করে ফেরার পথেই তাদের পথ আটকায় কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন বাজরাং দল। তারা রশিদের পরিবারকে হুমকি দেয় ও পুলিশকে ডাকে। পুলিশ এসে রশিদকে গ্রেপ্তার করে। মুসকানকে নিয়ে যাওয়া হয় আশ্রয়কেন্দ্রে। গ্রেপ্তারের সময় মুসকান তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিল যে, তারা সুখী দম্পতি। কিন্তু সে কথা কানে তোলেনি পুলিশ।
বাজরাং দলের নেতা ও মুরাদবাদের বাসিন্দা গৌরব ভাটনগর বলেন, মুসলিমরা এসবই করে। তারা ভালোবাসে আর কয়েক মাস পরে ‘লাভ জিহাদ’ করে। আমরা জানি যে, পিংকি (মুসকান) এখন ভালোবাসাই দেখছে। কিন্তু কয়েকদিন পরই সে টের পাবে যে, তাদের সঙ্গে জীবন কাটানো কতটা কঠিন।

তিনি বলেন, আমাদের কর্মীরা রাস্তা, মহল্লা, গ্রামে, শহরে সবখানে সক্রিয় আছে। আমাদের কাজই হচ্ছে লাভ জিহাদ ঘটলে পুলিশকে অবগত করা। আর এরপর আদালতের কাজ হচ্ছে তাদের শাস্তি দেওয়া। এ সপ্তাহের শনিবার সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে মুসকানের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন জাহান। কিন্তু তাকে ওই ভবনে ঢুকতে হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের পরিবারের সবার মধ্যে ভয় কাজ করছে। আমি জানি না তারা মুক্ত হলে কী হবে। কিন্তু আমি প্রচণ্ড ভীত। মুসকানকে আটকে রাখা ওই আশ্রয়কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল দ্য টেলিগ্রাফ। কিন্তু কোনো সাড়া পায়নি তারা।

সুত্র মানব জমিন অনলাইন