শিবগঞ্জের ইতিহাসের এক মহানায়কের নাম প্রফুল্ল চাকী5 মিনিটে পড়ুন

84

শিবগঞ্জ (বগুড়া) প্রতিনিধি: বগুড়ার শিবগঞ্জের প্রফুল্ল চাকী শুধু একটি নাম নয়। তিনি ইতিহাসের মহা নায়ক। প্রফুল্ল চাকী ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ও অগ্নিযুগের বিপ্লবী ছিলেন। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের শিবগঞ্জের বিহার গ্রামে জন্ম নেওয়া এই বাঙালি বিপ্লবী ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং জীবন বিসর্জন করেন। ইতিহাসের পাতায় প্রফুল্ল চাকী নামটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১০ ডিসেম্বর শিবগঞ্জের ইতিহাসের এই মহানায়ক প্রফুল্ল চাকীর জন্ম দিন।

শিবগঞ্জের ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়, প্রফুল্ল চাকীর জন্ম ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত বগুড়া জেলার শিবগঞ্জের বিহার গ্রামে। ছোটবেলায় তাকে বগুড়ার নামুজা জ্ঞানদা প্রসাদ বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। পরবর্তীতে তিনি বগুড়ার মাইনর স্কুলে ভর্তি হন। এরপর ১৯০২ সালে রংপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় পূর্ব বঙ্গ সরকারের কারলিসল সার্কুলারের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে তাকে রংপুর জিলা স্কুল হতে বহিস্কার করা হয়। এরপর তিনি রংপুরের কৈলাস রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে পড়ার সময় জীতেন্দ্রনারায়ণ রায়, অবিনাশ চক্রবর্তী, ঈশান চন্দ্র চক্রবর্তী সহ অন্যান্য বিপ্লবীর সাথে তার যোগাযোগ হয়, এবং তিনি বিপ্লবী ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হন।

১৯০৬ সালে কলকাতার বিপ্লবী নেতা বারীন ঘোষ প্রফুল্ল চাকীকে কলকাতায় নিয়ে আসেন। যেখানে প্রফুল্ল চাকী যুগান্তর দলে যোগ দেন। তার প্রথম দায়িত্ব ছিল পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জোসেফ ব্যামফিল্ড ফুলারকে হত্যা করা। কিন্তু এই পরিকল্পনা সফল হয়নি। এর পর প্রফুল্ল চাকী ক্ষুদিরাম বসুর সাথে কলকাতা প্রেসিডেন্সি ও পরে বিহারের মুজাফফরপুরের অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

এরপর ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী কিংসফোর্ডের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাকে ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যা বেলায় হত্যা করার পরিকল্পনা করেন। ইউরোপিয়ান ক্লাবের প্রবেশদ্বারে তারা কিংসফোর্ডের ঘোড়ার গাড়ির জন্য ওত পেতে থাকেন। একটি গাড়ি আসতে দেখে তারা বোমা নিক্ষেপ করেন। দুর্ভাগ্যক্রমে ঐ গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না, বরং দুইজন ব্রিটিশ মহিলা মারা যান তারা ছিলেন ভারতপ্রেমীক ব্যারিস্টার কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা। প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম তৎক্ষনাৎ ঐ এলাকা ত্যাগ করেন।

ওই ঘটনার পর, প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম আলাদা পথে পালাবার সিদ্ধান্ত নেন। প্রফুল্ল চাকী ছদ্মবেশে ট্রেনে করে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ২ মে তারিখে ট্রেনে নন্দলাল ব্যানার্জী নামে এক পুলিশ দারোগা সমস্তিপুর রেল স্টেশনের কাছে প্রফুল্ল চাকীকে সন্দেহ করেন। মোকামা স্টেশনে পুলিশের সম্মুখীন হয়ে প্রফুল্ল চাকী পালাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোণঠাসা হয়ে পড়ে তিনি ধরা দেওয়ার বদলে আত্মাহুতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিজের মাথায় পিস্তল দিয়ে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। পরবর্তীতে অনেক ঐতিহাসিক অনুমান করেন প্রফুল্ল চাকী আত্মহত্যা করেননি, তাকে পুলিশ খুন করে মাথা কেটে নেয়। ক্ষুদিরাম পরবর্তীকালে ধরা পড়েন এবং তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ব্রিটিশ পুলিস ইনস্পেকটর নন্দলালকে ৯ নভেম্বর ১৯০৮ সালে হত্যা করে প্রফুল্ল চাকীকে ধরিয়ে দেওয়ার বদলা নেন অপর দুই বাঙালী বিপ্লবী রনেণ গাঙ্গুলি ও শ্রী শচন্দ্র পাল।

শিবগঞ্জ উপজেলায় নিজ গ্রাম বিহারে তার নামে একটি সংগঠন আছে। প্রতিবছর ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে কিছু অনুষ্ঠান মালার আয়োজন করলেও বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেনা শিবগঞ্জের ইতিহাসের মহা নায়ক প্রফুল্ল চাকীর কথা।